সাংসদদের একটি বড় অংশ টেলিফোন বিল দেন না। বিল দিতে সাংসদদের অনীহা দেশের প্রথম সংসদ থেকেই চলছে। বর্তমান নবম সংসদেরও প্রায় অর্ধেক সদস্য বিল দিচ্ছেন না। যদিও তাঁরা টেলিফোন ভাতা নিচ্ছেন।
বিলখেলাপি সাংসদদের নিয়ে বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)। মামলা করেও অর্থ আদায় হচ্ছে না। কয়েকজনকে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। আবার অনেকে মারা গেছেন।
প্রথম থেকে অষ্টম জাতীয় সংসদ পর্যন্ত বিলখেলাপি সাংসদের সংখ্যা ১১৯ জন। এ ছাড়া ৭২ জন বিলখেলাপি সাংসদ মারা গেছেন। খোঁজ মিলছে না তিন সাংসদের। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এসব সাংসদের কাছে বিটিসিএলের পাওনা প্রায় দুই কোটি ৬১ লাখ ৯৩ হাজার ৩১৯ টাকা।
বর্তমান জাতীয় সংসদের ১৪৫ সাংসদের সরকারি টেলিফোন বিল বাকি। সংসদের শুরু থেকে মার্চ ২০১১ পর্যন্ত বকেয়া বিলের পরিমাণ ছয় লাখ ৯৭ হাজার ১৪১ টাকা। বিটিসিএলের রাজস্ব বিভাগের হিসাবে ১৪৫ সাংসদের কাছে পাওনা বকেয়া বিলের গড় চার হাজার ৮০৭ টাকা। যদিও সরকার সাংসদের প্রত্যেককে প্রতি মাসে ছয় হাজার টাকা টেলিফোন ভাতা হিসেবে বরাদ্দ দিয়ে আসছে।
বিটিসিএল সূত্র জানায়, মন্ত্রী-সাংসদ ছাড়া আর কোনো গ্রাহকের এত বড় অঙ্কের বকেয়া নেই। এই বিশাল পরিমাণ বকেয়া থাকার পরও একজন সাংসদের টেলিফোন-সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয় না।
সাংসদদের টেলিফোন বিল বাকি রাখার প্রবণতা সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেন, ‘যিনি বা যাঁরা সরকারের আইন মানেন না বা মানতে চান না, তিনি বা তাঁরা সরকারের আইনপ্রণেতা হতে পারেন না। তিনি জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পারেন, কিন্তু আইন তৈরির জন্য নৈতিক অধিকার তাঁর নেই। এমনকি তাঁদের জন্য পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকারও থাকা উচিত নয়।’
সম্প্রতি বিটিসিএল থেকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদন থেকে বিল না দেওয়ার এসব তথ্য জানা গেছে। বিল পরিশোধের তাগিদ দিয়ে বারবার চিঠি দেওয়ার পরও সাড়া দিচ্ছেন না অধিকাংশ সাংসদ। প্রতিবেদনটিতে প্রথম জাতীয় সংসদ থেকে অষ্টম জাতীয় সংসদ পর্যন্ত যেসব সাংসদ বিল পরিশোধ করেননি, তাঁদের তালিকা রয়েছে।
তবে চলতি সংসদের সদস্যদের এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। জানা গেছে, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কোনো সাংসদের বকেয়ার জন্য তাগাদাপত্র বা সতর্কীকরণ নোটিশ বা চিঠি পাঠানোর নিয়ম নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিটিসিএলের চেয়ারম্যান এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগসচিব সুনীল কান্তি বোস প্রথম আলোকে বলেন, চলতি সাংসদদের মোট বকেয়া সংসদের মেয়াদকাল শেষে গণনা করা হবে। এর আগে কাউকে বিলখেলাপি বলা যাবে না। এ কারণে চলতি সংসদের ১৪৫ জনের তালিকা প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে এবার বিল আদায় মোটামুটি সন্তোষজনক বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সুনীল কান্তি বোস আরও বলেন, অষ্টম সংসদ পর্যন্ত বিলখেলাপি মন্ত্রী-সাংসদদের বিভিন্ন সময়ে তাগাদাপত্র দেওয়া হয়েছে। তাঁদের কেউ কিস্তিতে বিল পরিশোধ করছেন, কেউ করছেন না। অনেকবার তাগাদাপত্রের পরও যাঁরা বিল দেননি, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিলখেলাপি ৭২ জন সাংসদ মারা যাওয়ায় তাঁদের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে চেষ্টা করেও বকেয়া বিল আদায় করা যায়নি। পরে মন্ত্রণালয় এসব সাংসদের কাছে পাওনা এক কোটি এক লাখ ৫৫ হাজার ১৩৪ টাকা মওকুফ করে দিতে বাধ্য হয়।
বিটিসিএলের নিয়ম অনুযায়ী সাধারণ গ্রাহকের পর পর দুই মাস বিল বাকি হলেই তাগাদাপত্র এবং সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সতর্কীকরণ চিঠি পাঠানো হয়। তৃতীয় মাসেও বিল না দিলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। কিন্তু মন্ত্রী-সাংসদের ক্ষেত্রে এ নিয়ম না মানার কারণে তাঁদের বকেয়া জমে যায়।
শীর্ষ ১৫ বিলখেলাপি: সপ্তম ও অষ্টম সংসদের দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সময় রাজশাহী-৪ আসনের বিএনপির সাংসদ নাদিম মোস্তফার বকেয়া নয় লাখ এক হাজার ৮৫ টাকা। অষ্টম সংসদের নওগাঁ-২ আসনের বিএনপির সাংসদ মো. সামসুজ্জোহা খানের বকেয়া বিল সাত লাখ সাত হাজার ৬২ টাকা। পঞ্চম সংসদে মহিলা-৫ আসনের বেগম রওশন ইলাহির বকেয়া পাঁচ লাখ ৩৯ হাজার ২৭৫ টাকা। পঞ্চম সংসদের কুষ্টিয়া-৪ আসনের আওয়ামী লীগের সাংসদ আবদুল আওয়াল মিয়ার বকেয়া পাঁচ লাখ ১৭ হাজার ৩০০ টাকা। পঞ্চম সংসদের চট্টগ্রাম-৪ আসনের আওয়ামী লীগের সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর বকেয়া চার লাখ ৫৩ হাজার ৭১৯ টাকা। অষ্টম সংসদে খুলনা-৩ আসনের বিএনপির হুইপ আশরাফ হোসেনের বকেয়া চার লাখ সাত হাজার ৩৩৭ টাকা। পঞ্চম সংসদের কক্সবাজার-৩ আসনের আওয়ামী লীগের মোস্তাক আহমেদের বকেয়া তিন লাখ ৯৩ হাজার ৭৮২ টাকা। পঞ্চম সংসদের কুড়িগ্রাম-২ আসনের জাতীয় পার্টির তাজুল ইসলাম চৌধুরীর বকেয়া তিন লাখ ৮৪ হাজার ৬৩১ টাকা। পঞ্চম সংসদে পাবনা-৪ আসনের বিএনপির সিরাজুল ইসলামের বকেয়া তিন লাখ ৬৮ হাজার ৯০০ টাকা। পঞ্চম সংসদের টাঙ্গাইল-৭ আসনের বিএনপির খন্দকার বদর উদ্দিনের বকেয়া তিন লাখ ৪৮ হাজার ১৩২ টাকা। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম সংসদ মিলিয়ে গাইবান্ধা-১ আসনের জাতীয় পার্টির হাফিজুর রহমান প্রামাণিকের বকেয়া তিন লাখ ৩৮ হাজার ৫৪৯ টাকা। তিনি মারা গেলেও তাঁর বকেয়া নিয়ে সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্তে আসেনি। চতুর্থ সংসদের কক্সবাজার-৪ আসনের জাতীয় পার্টির হাজি আবদুল গণির বকেয়া তিন লাখ ১৩ হাজার ৯৭ টাকা। পঞ্চম ও সপ্তম সংসদ মিলিয়ে ফেনী-২ আসনের আওয়ামী লীগের সাংসদ জয়নাল আবেদীন হাজারীর বকেয়া তিন লাখ ছয় হাজার ৯৬৬। চতুর্থ সংসদের গোপালগঞ্জ-১ আসনের জাতীয় পার্টির এম এইচ মঞ্জুর বকেয়া দুই লাখ ৬৮ হাজার ৪৯৩ টাকা। চতুর্থ সংসদের নওয়াবগঞ্জ-৩ আসনের জাসদের (রব) এহসান আলী খানের বকেয়া দুই লাখ ৪৯ হাজার ৪৩১ টাকা।
তাঁদের মধ্যে নাদিম মোস্তফা, বেগম রওশন ইলাহি, তাজুল ইসলামসহ অধিকাংশ ব্যক্তিই এ বিষয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে কোনো কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।
বকেয়া বিলের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সামসুজ্জোহা খান পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কেন জানতে চাইছেন। আপনি কি বিল দিয়ে দেবেন?’ প্রতিবেদন তৈরির জন্য বক্তব্য জানা দরকার বলার পর তিনি বলেন, ‘যত পারেন লিখেন।’ তিনি দাবি করেন, সরকারি ওই নম্বর (৯১৩৪১২৯) তিনি ব্যবহারই করেননি। তার পরও তাগাদাপত্র দেওয়ার বিষয়ে তিনি বিটিসিএলে অভিযোগ করেছেন।
সাবেক সাংসদ আবদুল আওয়াল মিয়া বলেন, প্রতিবেদনে উল্লেখ করা পাঁচ লাখ টাকার অঙ্ক ভুল। তিনি জানান, দেড় বছর ধরে তিনি মাসিক ২০ হাজার ৭০০ টাকা কিস্তিতে পরিশোধ করছেন। ইতিমধ্যে মোট বকেয়ার দুই-তৃতীয়াংশ পরিশোধ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সাবেক হুইপ আশরাফ হোসেন বলেন, ‘আমি তো হুইপ ছিলাম। সুতরাং সরকার সেই ফোনের বিল পরিশোধ করবে। আমার তো বিল দেওয়ার কথা নয়।’
নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী অসুস্থ। বিটিসিএল থেকে কোনো ধরনের বিল বা তাগাদাপত্র তিনি পাননি বলে জানান।
কোন সংসদে কত বকেয়া: প্রথম সংসদের বকেয়া ২৭ হাজার ৬৮৭ টাকা। তবে বিলখেলাপি চারজনই মারা গেছেন। দ্বিতীয় সংসদের ১৯ জনের বকেয়া এক লাখ ৩১ হাজার ৪৭ টাকা। তৃতীয় সংসদে বকেয়া তিন লাখ ৪৪ হাজার ২৫৩ টাকা। এই সংসদের ২৩ জন বিল পরিশোধ করেননি। চতুর্থ সংসদে বিল দেননি ৫২ জন, বকেয়া ৪৩ লাখ ৭৭ হাজার ১২৯ টাকা। পঞ্চম সংসদে বকেয়া ৬৪ লাখ ৫৮ হাজার ৪০৭ টাকা এবং খেলাপি ৫৪ জন। সপ্তম সংসদের ৩৩ জনের কাছে বকেয়া ২৬ লাখ ১২ হাজার ৯৯৬ টাকা। আর অষ্টম সংসদে বকেয়া ২১ লাখ ৪৮ হাজার ১৭ টাকা। বিল পরিশোধ করেননি ১৪ জন।
মারা যাওয়ার পর কত মওকুফ: বিটিসিএলের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রথম সংসদের চার বিলখেলাপি মারা গেছেন। এঁদের বকেয়া ২৭ হাজার ৬৮৭ টাকা। দ্বিতীয় সংসদের মারা গেছেন পাঁচজন। বকেয়া ১৭ হাজার ৮৭০ টাকা। তৃতীয় সংসদের মৃত পাঁচজনের বকেয়া ৮৭ হাজার ১৮৮ টাকা। চতুর্থ সংসদের মৃত ১০ জনের বকেয়া ১১ লাখ ৮৭ হাজার ১৮৩ টাকা। পঞ্চম সংসদের মৃত ২২ জনের বকেয়া ৫১ লাখ ৬১ হাজার ২৮৯ টাকা। সপ্তম সংসদের মৃত ১৫ জনের বকেয়া ৩২ লাখ ৪১ হাজার ৬৪৮ টাকা। অষ্টম সংসদের মৃত তিন জনের বকেয়া তিন লাখ ৮১ হাজার ৫৬৭ টাকা। এঁদের মওকুফ করা মোট বিলের পরিমাণ এক কোটি এক লাখ চার হাজার ৪৩২ টাকা।
এদিকে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তালিকার আরও ১৫ সাংসদ মারা গেছেন। তাঁদের বকেয়া ২৩ লাখ ২৫ হাজার ১৭২ টাকা মওকুফেরও প্রক্রিয়া চলছে।
মন্ত্রী-প্রভাবশালী খেলাপি: বর্তমান বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর আগের বকেয়া ২৯ হাজার ৪০১ টাকা। ডেপুটি স্পিকার শওকত আলীর বকেয়া ছয় হাজার ৮৭৩ টাকা। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বকেয়া রয়েছে ১৩ হাজার ৬০০ টাকা, হুইপ আ স ম ফিরোজের বকেয়া দুই লাখ ছয় হাজার ২১১ টাকা, জাসদের আ স ম আবদুর রবের বকেয়া ২১ হাজার ২২১ টাকা, বিএনপির আবদুল মতিন চৌধুরীর বকেয়া ৩৫ হাজার ৮৯০ টাকা, আওয়ামী লীগের আক্তারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর বকেয়া ৩২ হাজার ৩৩৫ টাকা। জাতীয় পার্টির সরদার আমজাদ হোসেনের বকেয়া ৯৫ হাজার ৮৫০ টাকা। আওয়ামী লীগের আ খ ম জাহাঙ্গীরের বকেয়া ৯৩ হাজার ৭২৫ টাকা।
বকেয়া বিল সম্পর্কে লতিফ সিদ্দিকী বলেন, মোট এক লাখ ২৯ হাজার ৪০০ টাকা কিস্তিতে পরিশোধ করছেন। বাকি টাকাও কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধ করবেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখনো আমার কাছে কোনো বিল আসেনি। বিল হাতে পেলেই বকেয়া পরিশোধ করে দেব।’ ডেপুটি স্পিকার শওকত আলীর সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করতে চাননি।
সরকারি দলের হুইপ আ স ম ফিরোজ বলেন, ‘প্রথমে জানতাম না এই বিল আমাকেই পরিশোধ করতে হবে। তাগাদাপত্র পেয়ে বুঝেছি, বিল আমাকেই দিতে হবে।’ তিনি জানান, মাসে পাঁচ হাজার টাকা কিস্তিতে বিল পরিশোধ করবেন। আগামী নির্বাচনের আগেই এ বিল শোধ হয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নিখোঁজ সাংসদ: তৃতীয় সংসদের মহিলা-২৪ আসনের মীনা জামানের খোঁজ মিলছে না। তাঁর কাছে বকেয়া ২৫ হাজার ১৭৮ টাকা। চতুর্থ সংসদে সুনামগঞ্জ-২ আসনের গোলাম জিলানী চৌধুরীকে খুঁজে পাচ্ছে না বিটিসিএল। তাঁর কাছে বকেয়া ১৩ হাজার ৪০৬ টাকা। সিলেট-৬ আসনের এ কে এম গৌছ উদ্দিন বর্তমানে ফৌজদারি মামলার পলাতক আসামি। তাঁর কাছে বকেয়া এক লাখ ৯৮ হাজার ৫৬৬ টাকা।
এর বাইরে শরীয়তপুর-২ আসনের সাংসদ এ টি এম গিয়াসউদ্দিন ‘ওই সময় মন্ত্রী ছিলেন না’ বলে অভিযোগ করায় বিটিসিএল বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। তাঁর কাছে বকেয়া রয়েছে তিন লাখ ৬৯ হাজার ৯৫ টাকা।
সূত্র:প্রথমআলো, ২৫/০৬/২০১১
বিলখেলাপি সাংসদদের নিয়ে বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)। মামলা করেও অর্থ আদায় হচ্ছে না। কয়েকজনকে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। আবার অনেকে মারা গেছেন।
প্রথম থেকে অষ্টম জাতীয় সংসদ পর্যন্ত বিলখেলাপি সাংসদের সংখ্যা ১১৯ জন। এ ছাড়া ৭২ জন বিলখেলাপি সাংসদ মারা গেছেন। খোঁজ মিলছে না তিন সাংসদের। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এসব সাংসদের কাছে বিটিসিএলের পাওনা প্রায় দুই কোটি ৬১ লাখ ৯৩ হাজার ৩১৯ টাকা।
বর্তমান জাতীয় সংসদের ১৪৫ সাংসদের সরকারি টেলিফোন বিল বাকি। সংসদের শুরু থেকে মার্চ ২০১১ পর্যন্ত বকেয়া বিলের পরিমাণ ছয় লাখ ৯৭ হাজার ১৪১ টাকা। বিটিসিএলের রাজস্ব বিভাগের হিসাবে ১৪৫ সাংসদের কাছে পাওনা বকেয়া বিলের গড় চার হাজার ৮০৭ টাকা। যদিও সরকার সাংসদের প্রত্যেককে প্রতি মাসে ছয় হাজার টাকা টেলিফোন ভাতা হিসেবে বরাদ্দ দিয়ে আসছে।
বিটিসিএল সূত্র জানায়, মন্ত্রী-সাংসদ ছাড়া আর কোনো গ্রাহকের এত বড় অঙ্কের বকেয়া নেই। এই বিশাল পরিমাণ বকেয়া থাকার পরও একজন সাংসদের টেলিফোন-সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয় না।
সাংসদদের টেলিফোন বিল বাকি রাখার প্রবণতা সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেন, ‘যিনি বা যাঁরা সরকারের আইন মানেন না বা মানতে চান না, তিনি বা তাঁরা সরকারের আইনপ্রণেতা হতে পারেন না। তিনি জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পারেন, কিন্তু আইন তৈরির জন্য নৈতিক অধিকার তাঁর নেই। এমনকি তাঁদের জন্য পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকারও থাকা উচিত নয়।’
সম্প্রতি বিটিসিএল থেকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদন থেকে বিল না দেওয়ার এসব তথ্য জানা গেছে। বিল পরিশোধের তাগিদ দিয়ে বারবার চিঠি দেওয়ার পরও সাড়া দিচ্ছেন না অধিকাংশ সাংসদ। প্রতিবেদনটিতে প্রথম জাতীয় সংসদ থেকে অষ্টম জাতীয় সংসদ পর্যন্ত যেসব সাংসদ বিল পরিশোধ করেননি, তাঁদের তালিকা রয়েছে।
তবে চলতি সংসদের সদস্যদের এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। জানা গেছে, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কোনো সাংসদের বকেয়ার জন্য তাগাদাপত্র বা সতর্কীকরণ নোটিশ বা চিঠি পাঠানোর নিয়ম নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিটিসিএলের চেয়ারম্যান এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগসচিব সুনীল কান্তি বোস প্রথম আলোকে বলেন, চলতি সাংসদদের মোট বকেয়া সংসদের মেয়াদকাল শেষে গণনা করা হবে। এর আগে কাউকে বিলখেলাপি বলা যাবে না। এ কারণে চলতি সংসদের ১৪৫ জনের তালিকা প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে এবার বিল আদায় মোটামুটি সন্তোষজনক বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সুনীল কান্তি বোস আরও বলেন, অষ্টম সংসদ পর্যন্ত বিলখেলাপি মন্ত্রী-সাংসদদের বিভিন্ন সময়ে তাগাদাপত্র দেওয়া হয়েছে। তাঁদের কেউ কিস্তিতে বিল পরিশোধ করছেন, কেউ করছেন না। অনেকবার তাগাদাপত্রের পরও যাঁরা বিল দেননি, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিলখেলাপি ৭২ জন সাংসদ মারা যাওয়ায় তাঁদের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে চেষ্টা করেও বকেয়া বিল আদায় করা যায়নি। পরে মন্ত্রণালয় এসব সাংসদের কাছে পাওনা এক কোটি এক লাখ ৫৫ হাজার ১৩৪ টাকা মওকুফ করে দিতে বাধ্য হয়।
বিটিসিএলের নিয়ম অনুযায়ী সাধারণ গ্রাহকের পর পর দুই মাস বিল বাকি হলেই তাগাদাপত্র এবং সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সতর্কীকরণ চিঠি পাঠানো হয়। তৃতীয় মাসেও বিল না দিলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। কিন্তু মন্ত্রী-সাংসদের ক্ষেত্রে এ নিয়ম না মানার কারণে তাঁদের বকেয়া জমে যায়।
শীর্ষ ১৫ বিলখেলাপি: সপ্তম ও অষ্টম সংসদের দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সময় রাজশাহী-৪ আসনের বিএনপির সাংসদ নাদিম মোস্তফার বকেয়া নয় লাখ এক হাজার ৮৫ টাকা। অষ্টম সংসদের নওগাঁ-২ আসনের বিএনপির সাংসদ মো. সামসুজ্জোহা খানের বকেয়া বিল সাত লাখ সাত হাজার ৬২ টাকা। পঞ্চম সংসদে মহিলা-৫ আসনের বেগম রওশন ইলাহির বকেয়া পাঁচ লাখ ৩৯ হাজার ২৭৫ টাকা। পঞ্চম সংসদের কুষ্টিয়া-৪ আসনের আওয়ামী লীগের সাংসদ আবদুল আওয়াল মিয়ার বকেয়া পাঁচ লাখ ১৭ হাজার ৩০০ টাকা। পঞ্চম সংসদের চট্টগ্রাম-৪ আসনের আওয়ামী লীগের সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর বকেয়া চার লাখ ৫৩ হাজার ৭১৯ টাকা। অষ্টম সংসদে খুলনা-৩ আসনের বিএনপির হুইপ আশরাফ হোসেনের বকেয়া চার লাখ সাত হাজার ৩৩৭ টাকা। পঞ্চম সংসদের কক্সবাজার-৩ আসনের আওয়ামী লীগের মোস্তাক আহমেদের বকেয়া তিন লাখ ৯৩ হাজার ৭৮২ টাকা। পঞ্চম সংসদের কুড়িগ্রাম-২ আসনের জাতীয় পার্টির তাজুল ইসলাম চৌধুরীর বকেয়া তিন লাখ ৮৪ হাজার ৬৩১ টাকা। পঞ্চম সংসদে পাবনা-৪ আসনের বিএনপির সিরাজুল ইসলামের বকেয়া তিন লাখ ৬৮ হাজার ৯০০ টাকা। পঞ্চম সংসদের টাঙ্গাইল-৭ আসনের বিএনপির খন্দকার বদর উদ্দিনের বকেয়া তিন লাখ ৪৮ হাজার ১৩২ টাকা। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম সংসদ মিলিয়ে গাইবান্ধা-১ আসনের জাতীয় পার্টির হাফিজুর রহমান প্রামাণিকের বকেয়া তিন লাখ ৩৮ হাজার ৫৪৯ টাকা। তিনি মারা গেলেও তাঁর বকেয়া নিয়ে সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্তে আসেনি। চতুর্থ সংসদের কক্সবাজার-৪ আসনের জাতীয় পার্টির হাজি আবদুল গণির বকেয়া তিন লাখ ১৩ হাজার ৯৭ টাকা। পঞ্চম ও সপ্তম সংসদ মিলিয়ে ফেনী-২ আসনের আওয়ামী লীগের সাংসদ জয়নাল আবেদীন হাজারীর বকেয়া তিন লাখ ছয় হাজার ৯৬৬। চতুর্থ সংসদের গোপালগঞ্জ-১ আসনের জাতীয় পার্টির এম এইচ মঞ্জুর বকেয়া দুই লাখ ৬৮ হাজার ৪৯৩ টাকা। চতুর্থ সংসদের নওয়াবগঞ্জ-৩ আসনের জাসদের (রব) এহসান আলী খানের বকেয়া দুই লাখ ৪৯ হাজার ৪৩১ টাকা।
তাঁদের মধ্যে নাদিম মোস্তফা, বেগম রওশন ইলাহি, তাজুল ইসলামসহ অধিকাংশ ব্যক্তিই এ বিষয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে কোনো কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।
বকেয়া বিলের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সামসুজ্জোহা খান পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কেন জানতে চাইছেন। আপনি কি বিল দিয়ে দেবেন?’ প্রতিবেদন তৈরির জন্য বক্তব্য জানা দরকার বলার পর তিনি বলেন, ‘যত পারেন লিখেন।’ তিনি দাবি করেন, সরকারি ওই নম্বর (৯১৩৪১২৯) তিনি ব্যবহারই করেননি। তার পরও তাগাদাপত্র দেওয়ার বিষয়ে তিনি বিটিসিএলে অভিযোগ করেছেন।
সাবেক সাংসদ আবদুল আওয়াল মিয়া বলেন, প্রতিবেদনে উল্লেখ করা পাঁচ লাখ টাকার অঙ্ক ভুল। তিনি জানান, দেড় বছর ধরে তিনি মাসিক ২০ হাজার ৭০০ টাকা কিস্তিতে পরিশোধ করছেন। ইতিমধ্যে মোট বকেয়ার দুই-তৃতীয়াংশ পরিশোধ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সাবেক হুইপ আশরাফ হোসেন বলেন, ‘আমি তো হুইপ ছিলাম। সুতরাং সরকার সেই ফোনের বিল পরিশোধ করবে। আমার তো বিল দেওয়ার কথা নয়।’
নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী অসুস্থ। বিটিসিএল থেকে কোনো ধরনের বিল বা তাগাদাপত্র তিনি পাননি বলে জানান।
কোন সংসদে কত বকেয়া: প্রথম সংসদের বকেয়া ২৭ হাজার ৬৮৭ টাকা। তবে বিলখেলাপি চারজনই মারা গেছেন। দ্বিতীয় সংসদের ১৯ জনের বকেয়া এক লাখ ৩১ হাজার ৪৭ টাকা। তৃতীয় সংসদে বকেয়া তিন লাখ ৪৪ হাজার ২৫৩ টাকা। এই সংসদের ২৩ জন বিল পরিশোধ করেননি। চতুর্থ সংসদে বিল দেননি ৫২ জন, বকেয়া ৪৩ লাখ ৭৭ হাজার ১২৯ টাকা। পঞ্চম সংসদে বকেয়া ৬৪ লাখ ৫৮ হাজার ৪০৭ টাকা এবং খেলাপি ৫৪ জন। সপ্তম সংসদের ৩৩ জনের কাছে বকেয়া ২৬ লাখ ১২ হাজার ৯৯৬ টাকা। আর অষ্টম সংসদে বকেয়া ২১ লাখ ৪৮ হাজার ১৭ টাকা। বিল পরিশোধ করেননি ১৪ জন।
মারা যাওয়ার পর কত মওকুফ: বিটিসিএলের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রথম সংসদের চার বিলখেলাপি মারা গেছেন। এঁদের বকেয়া ২৭ হাজার ৬৮৭ টাকা। দ্বিতীয় সংসদের মারা গেছেন পাঁচজন। বকেয়া ১৭ হাজার ৮৭০ টাকা। তৃতীয় সংসদের মৃত পাঁচজনের বকেয়া ৮৭ হাজার ১৮৮ টাকা। চতুর্থ সংসদের মৃত ১০ জনের বকেয়া ১১ লাখ ৮৭ হাজার ১৮৩ টাকা। পঞ্চম সংসদের মৃত ২২ জনের বকেয়া ৫১ লাখ ৬১ হাজার ২৮৯ টাকা। সপ্তম সংসদের মৃত ১৫ জনের বকেয়া ৩২ লাখ ৪১ হাজার ৬৪৮ টাকা। অষ্টম সংসদের মৃত তিন জনের বকেয়া তিন লাখ ৮১ হাজার ৫৬৭ টাকা। এঁদের মওকুফ করা মোট বিলের পরিমাণ এক কোটি এক লাখ চার হাজার ৪৩২ টাকা।
এদিকে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তালিকার আরও ১৫ সাংসদ মারা গেছেন। তাঁদের বকেয়া ২৩ লাখ ২৫ হাজার ১৭২ টাকা মওকুফেরও প্রক্রিয়া চলছে।
মন্ত্রী-প্রভাবশালী খেলাপি: বর্তমান বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর আগের বকেয়া ২৯ হাজার ৪০১ টাকা। ডেপুটি স্পিকার শওকত আলীর বকেয়া ছয় হাজার ৮৭৩ টাকা। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বকেয়া রয়েছে ১৩ হাজার ৬০০ টাকা, হুইপ আ স ম ফিরোজের বকেয়া দুই লাখ ছয় হাজার ২১১ টাকা, জাসদের আ স ম আবদুর রবের বকেয়া ২১ হাজার ২২১ টাকা, বিএনপির আবদুল মতিন চৌধুরীর বকেয়া ৩৫ হাজার ৮৯০ টাকা, আওয়ামী লীগের আক্তারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর বকেয়া ৩২ হাজার ৩৩৫ টাকা। জাতীয় পার্টির সরদার আমজাদ হোসেনের বকেয়া ৯৫ হাজার ৮৫০ টাকা। আওয়ামী লীগের আ খ ম জাহাঙ্গীরের বকেয়া ৯৩ হাজার ৭২৫ টাকা।
বকেয়া বিল সম্পর্কে লতিফ সিদ্দিকী বলেন, মোট এক লাখ ২৯ হাজার ৪০০ টাকা কিস্তিতে পরিশোধ করছেন। বাকি টাকাও কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধ করবেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখনো আমার কাছে কোনো বিল আসেনি। বিল হাতে পেলেই বকেয়া পরিশোধ করে দেব।’ ডেপুটি স্পিকার শওকত আলীর সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করতে চাননি।
সরকারি দলের হুইপ আ স ম ফিরোজ বলেন, ‘প্রথমে জানতাম না এই বিল আমাকেই পরিশোধ করতে হবে। তাগাদাপত্র পেয়ে বুঝেছি, বিল আমাকেই দিতে হবে।’ তিনি জানান, মাসে পাঁচ হাজার টাকা কিস্তিতে বিল পরিশোধ করবেন। আগামী নির্বাচনের আগেই এ বিল শোধ হয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নিখোঁজ সাংসদ: তৃতীয় সংসদের মহিলা-২৪ আসনের মীনা জামানের খোঁজ মিলছে না। তাঁর কাছে বকেয়া ২৫ হাজার ১৭৮ টাকা। চতুর্থ সংসদে সুনামগঞ্জ-২ আসনের গোলাম জিলানী চৌধুরীকে খুঁজে পাচ্ছে না বিটিসিএল। তাঁর কাছে বকেয়া ১৩ হাজার ৪০৬ টাকা। সিলেট-৬ আসনের এ কে এম গৌছ উদ্দিন বর্তমানে ফৌজদারি মামলার পলাতক আসামি। তাঁর কাছে বকেয়া এক লাখ ৯৮ হাজার ৫৬৬ টাকা।
এর বাইরে শরীয়তপুর-২ আসনের সাংসদ এ টি এম গিয়াসউদ্দিন ‘ওই সময় মন্ত্রী ছিলেন না’ বলে অভিযোগ করায় বিটিসিএল বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। তাঁর কাছে বকেয়া রয়েছে তিন লাখ ৬৯ হাজার ৯৫ টাকা।
সূত্র:প্রথমআলো, ২৫/০৬/২০১১
No comments:
Post a Comment