জাতীয় সংসদের প্রত্যেক সদস্যের নির্বাচনী এলাকায় অন্তত ১০০ কিলোমিটার করে নতুন বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। উৎপাদন বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আরও বেশিসংখ্যক মানুষকে বিদ্যুৎ সরবরাহের আওতায় আনাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে।
বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলেও প্রত্যেক সাংসদের এলাকায় ১০০ কিলোমিটার করে নতুন বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর কিছুটা বাস্তবায়নও করা হয়। কিন্তু ওই সময় বিদ্যুতের ঘাটতি থাকায় এবং ঘাটতি ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকায় নতুন তৈরি করা বিতরণ লাইনের অনেকগুলোতেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।
তবে ওই সময় বিদ্যুৎ দিতে না পারলেও বিদ্যুতের খুঁটি (খাম্বা) বিক্রি করে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা লাভবান
হয়েছিলেন। আর লোকসান বেড়েছিল আরইবির। তবে এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন বলে সরকারি সূত্র জানায়।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিদ্যুৎসচিব মো. আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা সম্প্রসারণের বিষয়টি প্রত্যেক সাংসদের এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ছে। তাই বিতরণের ব্যবস্থাও সারা দেশেই সম্প্রসারণ করতে হবে। সেই উদ্যোগই নেওয়া হচ্ছে।
সাংসদদের চাহিদা: স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় নতুন বিদ্যুৎ লাইন তৈরির জন্য প্রায় প্রত্যেক সাংসদেরই দাবি ও তদবির রয়েছে।
বর্তমান সরকারের আড়াই বছরের শাসনকালে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট। এখন থেকে প্রতি মাসেই নতুন বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এ অবস্থায় সরকার বিদ্যুৎ বিতরণ বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়লেও এখন পর্যন্ত গ্রামাঞ্চলে, বিশেষ করে আরইবির আওতাধীন এলাকাসমূহে বিদ্যুৎ সরবরাহ চাহিদার তুলনায় ৬০ শতাংশের বেশি কখনোই নয়। ঢাকাসহ শহরাঞ্চলেও এখন পর্যন্ত এমন কোনো দিন নেই যে অন্তত দুই বার করে লোডশেডিং হচ্ছে না। তা ছাড়া, বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তৈরি বিতরণ লাইনের বেশ কিছু অংশ এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের আওতায় আনা যায়নি।
বিদ্যুৎসচিব বলেন, বিভিন্ন বিতরণকারী সংস্থার কাছে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য প্রায় ছয় লাখ আবেদনকারীর দরখাস্ত জমা আছে। তাঁদের সবাইকে সংযোগ দিতে প্রায় ৬০০ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুতের দরকার হবে। কিন্তু আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে অন্তত এক হাজার মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এভাবে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়তে থাকায় বিদ্যমান আবেদনকারীদের সবাইকে আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে সংযোগ দেওয়া শেষ করা হবে।
এই নতুন সংযোগের জন্যও দুই কিলোওয়াটের বেশি চাহিদার ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল স্থাপনসহ যেসব শর্ত ছিল, তা বহাল থাকবে বলেও বিদ্যুৎসচিব জানান।
অগ্রাধিকার পাবে গ্রাম: সরকারি সূত্র জানায়, নতুন বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন স্থাপনের উদ্যোগে মফস্বল শহর ও গ্রামাঞ্চল, বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতাধীন এলাকা অগ্রাধিকার পাবে। এ জন্য আরইবির আওতায় বাস্তবায়নের জন্য ইতিমধ্যে চার বছর মেয়াদি (জুলাই ’১১ থেকে জুন ২০১৫) একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের অধীনে প্রায় সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার নতুন বিতরণ লাইন (১১ কেভি) ছাড়াও দুই হাজার কিলোমিটার নতুন ৩৩ কেভি লাইন তৈরি, ৫০০ কিলোমিটার পুরোনো ৩৩ কেভি লাইন সংস্কার, ১০০ নতুন উপকেন্দ্র নির্মাণ এবং পাঁচটি পুরোনো উপকেন্দ্র সংস্কার করা হবে।
পাঁচটি বিভাগীয় শহরে (ঢাকা ও চট্টগ্রাম বাদে) বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন সম্প্রসারণের একটি প্রকল্পও চালু করা হয়েছে। এই দুটি প্রকল্পের অধীনে মোট ১৮ হাজার ২০০ কিলোমিটার বিতরণ লাইন তৈরি করে প্রায় ২০ লাখ নতুন গ্রাহককে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
দেশের সব গ্রাম বিদ্যুতায়িত করার লক্ষ্যে ১৯৭৭ সালে আরইবি কার্যক্রম শুরুর পর থেকে গত এপ্রিল মাস পর্যন্ত দুই লাখ ২২ হাজার ৮০৮ কিলোমিটার বিতরণ লাইন তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে দেশের ৮৭ হাজার ৩৭২টি গ্রামের মধ্যে ৪৮ হাজার ৭৫৪টি গ্রামে বিদ্যুৎ-সুবিধা পৌঁছেছে।
এ ছাড়া জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুৎ-সুবিধা পৌঁছায়নি এমন প্রায় ১০ লাখ বাড়িতে এখন সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে।
অরুণ কর্মকার | তারিখ: ১০-০৭-২০১১
সূত্র:প্রথমআলো
No comments:
Post a Comment