সুদানের দক্ষিণাংশে আনন্দের বন্যা বইছে। আনন্দ-উল্লাস পথে-ঘাটে, ঘরে ঘরে। দীর্ঘ কয়েক দশকের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর লাখ লাখ মানুষের জীবনের বিনিময়ে নতুন দেশ পেয়েছে সেখানকার মানুষ। স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ দক্ষিণ সুদান।
‘আমরা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত জনগণের প্রতিনিধি, দক্ষিণ সুদানের মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে এবং স্বনিয়ন্ত্রণের গণভোটে জিতে দক্ষিণ সুদানকে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে ঘোষণা করছি।’
জুবা শহরে গতকাল শনিবার আমন্ত্রিত বিশ্বনেতাদের সামনে পার্লামেন্টের স্পিকার জেমস ওয়ানি ইগারের এই ঘোষণার পরপরই উল্লাসে ফেটে পড়ে গোটা শহর, পুরো দেশ। এটা দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতার ঘোষণা। স্বাধীন দেশ হিসেবে দক্ষিণ সুদানের যাত্রা শুরু। জুবা নবীনতম এই দেশটির রাজধানী। খবর এএফপি, বিবিসি ও রয়টার্স।
স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই আকাশে তুলে দেওয়া হয় নতুন দেশের পতাকা। বাঁধভাঙা উল্লাস ও সংগ্রামী মানুষের চোখের জলের সঙ্গে পতপত করে উড়তে থাকে জাতীয় পতাকা। চোখের জল মুছতে মুছতে মানুষ স্লোগান দিতে থাকে, ‘আমরা কখনোই হার মানব না, কখনোই না।’
দক্ষিণ সুদান জাতিসংঘ স্বীকৃত ১৯৩তম স্বাধীন দেশ। আফ্রিকার ৫৪তম স্বাধীন রাষ্ট্র।
হাজার হাজার উৎফুল্ল মানুষের সামনে সংবিধানে স্বাক্ষর করে নতুন দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন সালভা কির মায়ার দিত। দক্ষিণ সুদানের বিদ্রোহী সংগঠন সুদান পিপলস লিবারেশন মুভমেন্টের (এসপিএলএম) সামরিক প্রধান ছিলেন তিনি। তা ছাড়া সদ্য ছেড়ে আসা সুদানের ডেপুটি প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর বশির। যে দেশ ভেঙে নতুন দেশ জন্ম নিল, সেই দেশের প্রেসিডেন্ট তিনি। তিনি দেখলেন, তাঁর সামনে দিয়ে কুচকাওয়াজ করে যাচ্ছে হাজার হাজার বিদ্রোহী সেনা, ১৬ বছর ধরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে যাদের তিনি হার মানাতে পারেননি।
গণভোটে সুদানকে উত্তর-দক্ষিণে ভাগ করার সর্বসম্মত রায়ের ঠিক ছয় মাস পর গতকাল দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতার ঘোষণা এল।
যোসেফ লেগি নামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমাদের জন্য এ এক ঐতিহাসিক দিন। উত্তরের পতাকা নেমে আসবে আর দক্ষিণের পতাকা আকাশে উঠে যাবে, এ দৃশ্য দেখার জন্য আমাদের আর তর সইছিল না।’
১৯৫৬ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা পায় সুদান। এর পর থেকে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাংশের মধ্যে গৃহযুদ্ধ চলছিল—আফ্রিকার সবচেয়ে দীর্ঘতর এ সংঘাত। শান্তি প্রতিষ্ঠায় ২০০৫ সালে হয়েছিল চুক্তি। কিন্তু এর পরও যুদ্ধ চালিয়ে যায় দক্ষিণের বিদ্রোহীরা। সেই লড়াইয়ের পথ ধরে এল স্বাধীনতা।
কালকের স্বাধীনতা ঘোষণার অনুষ্ঠানটি হলো বিদ্রোহী নেতা জন গারাংয়ের সমাধিতে। ২০০৫ সালের শান্তি চুক্তির কয়েক মাস পরেই নিহত হয়েছিলেন তিনি।
সুদানের আর্চ বিশপ দানিয়েল ডেং বোল বলেন, ‘এটা একটা ঐতিহাসিক দিন, সুবিচার প্রতিষ্ঠার দিন। এই দিন দেখে যেতে পারায় আমি খুবই খুশি। আজ থেকে আমরা নতুন জীবন পেলাম, ভুলে গেলাম ফেলে আসা দিনের দুঃখ-কষ্ট।’
স্বাধীনতার প্রথম প্রহর উদ্যাপনের জন্য শুক্রবার মধ্যরাত থেকেই পথে নেমে আসে হাজার হাজার মানুষ। রাতভর তারা নেচে-গেয়ে আর আতশবাজি পুড়িয়ে উল্লাস করে।
দক্ষিণ সুদানের পরিচিতি: রাষ্ট্রীয় নাম গণপ্রজাতন্ত্রী দক্ষিণ সুদান। রাজধানী হোয়াইট নীল নদীতীরবর্তী শহর জুবা। দেশটির আয়তন ছয় লাখ ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ।
সুদানের দক্ষিণাংশের ১০টি প্রদেশ নিয়ে স্বাধীন হলো দক্ষিণ সুদান।
দক্ষিণ সুদানের রাষ্ট্রীয় ভাষা হবে ইংরেজি ও আরবি। দেশের বেশির ভাগ মানুষ ও আরবি ও দিনকা ভাষাতেই কথা বলে। প্রধান নৃগোষ্ঠী দিনকা। এ ছাড়া একটা বড় অংশ নুয়ের ও শিল্লুক।

No comments:
Post a Comment