কাদের গনি চৌধুরী
ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ডিও ছাড়া চাকরি নাই সরকারি বা আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানে। ব্যাংক-বীমা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সর্বত্রই একই চিত্র। সরকারি চাকরি পেতে হলে আগে দলীয় পরিচয় নিশ্চিত করতে হচ্ছে। আর দলীয় পরিচয় নিশ্চিত করতে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের (এমপি) আধাসরকারিপত্র (ডিও লেটার) বা ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র
সংযুক্ত করতে হচ্ছে। যতই যোগ্যতা থাকুক না কেন ডিও ছাড়া চাকরি মিলছে না কারও। অনেক ক্ষেত্রে মন্ত্রী, মন্ত্রী পদমর্যাদার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বা প্রতিমন্ত্রীর কাছ থেকে সুপারিশ নেয়া হলেও কাজে আসছে না। তার সঙ্গে স্থানীয় এমপি বা অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের চিঠি জুড়ে দিতে হচ্ছে। তবেই মিলছে চাকরি।
সরকারি, আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন অবস্থা বেশি ঘটছে। দ্বিতীয় ও প্রথম শ্রেণীর নন-ক্যাডার পদেও এমন ঘটনা ঘটছে। তবে তা অপেক্ষাকৃত কম। সর্বত্র এই হারে দলীয় নিয়োগের ফলে ধীরে ধীরে প্রশাসন মেধাশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রশাসন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দলীয় বিবেচনায় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হলে তা প্রশাসনের জন্য ভালো ফল বয়ে আনে না। এতে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা কাজের চেয়ে দলবাজিতে মনোনিবেশ করেন বেশি।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজস্ব খাতে ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০১ জন লোক নিয়োগ করেছে। এছাড়া গত ৬ মাসে আরও ২০ হাজারের মতো লোক নিয়োগের হিসাব পাওয়া গেছে। এসব নিয়োগের বেশিরভাগই দেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের তালিকা এবং রাজনৈতিক ডিও লেটার দেখে। সরকারি সূত্রে জানা যায়, এখনও রাজস্ব খাতে ২ লাখ ৭৪ হাজার ১১১টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে তৃতীয় শ্রেণীর শূন্যপদের সংখ্যা ১ লাখ ৪০ হাজর ৬৪১টি। এসব পদেও সরকার দ্রুত নিয়োগ দিতে উদ্যোগী হয়েছে।
গত ২ বছরে সবচেয়ে বেশি নিয়োগ হয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। এখানে কেবল নারী কর্মীই নিয়োগ করা হয়েছে ৩৮ হাজার ৮২৩ জন । খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় গত অর্থবছরে এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গ্রামীণ এলাকায় ৮ লাখ ৫৫ হাজার, কাবিখা ও টিআর কর্মসূচির মাধ্যমে ৫৩ লাখ ৬৭ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। এক্ষেত্রেও দলীয় লোকরাই কাজ পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, সরকার আরও কর্মসংস্থানের জন্য নতুন পদ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২ হাজার ৮০০ নতুন পদ সৃষ্টি করতে যাচ্ছে সরকার।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে সাবেক উপদেষ্টা ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব আকবর আলি খান বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া কোনো সময়ই ভালো নয়। একই সঙ্গে এটি সংবিধানসম্মতও নয়। কারণ সংবিধানে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়ার কোনো কথা নেই। আমার দেশ-এর অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত আড়াই বছরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, জেলা জজ থেকে শুরু করে আয়া পর্যন্ত সব নিয়োগই হয়েছে দলীয় সুপারিশে। খাদ্য অধিদফতর, প্রাথমিক শিক্ষক, মেডিকেল অফিসার, পুলিশ, ডাক বিভাগ, রেল ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থা, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, সিভিল সার্জন অফিস, বিআইডব্লিউটিসি, বিআইডব্লিউটিএ, স্বাস্থ্য অধিদফতরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ডিও ছাড়া কারও নিয়োগ হচ্ছে না। সবাই এমপির ডিও লেটার যুক্ত করে আসছেন চাকরি পেতে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে এমপিরা ডিও লেটারের প্রতিটি কপি আলাদাভাবে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব ও সংস্থা প্রধানের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এর ফলে সিদ্ধান্ত নিতে কাউকেই কোনো ধরনের বেগ পেতে হচ্ছে না।
সংস্থাপন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথমদিকে ডিও বাধ্যতামূলক করা না হলেও পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সিভিল সার্জন অফিসে নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক হাঙ্গামার পর থেকেই এই সিস্টেম চালু হয়েছে। এর ফলে সরকারি শূন্যপদে নিয়োগ হচ্ছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। এদিকে খাদ্য অধিদফতর ও স্বাস্থ্য অধিদফতরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি দল ও অঙ্গ সংগঠনের প্রত্যয়নপত্র ছাড়া চাকরির আবেদন আমলে নেয়া হচ্ছে না। সম্প্রতি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার এক ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি খাদ্য বিভাগে চাকরির জন্য প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন। প্রত্যয়নে এক প্রার্থীর নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তিনি আওয়ামী যুবলীগের সঙ্গে জড়িত। বিগত জোট সরকারের আমলে তিনি এবং তার পরিবার বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হন। তাই তাকে যেন চাকরি দেয়া হয়। এ ধরনের প্রত্যয়ন নিয়ে অনেককে খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের কাছে তদবির করতে আসতে দেখা যায়। রেলওয়েতে নিয়োগ পেতে আসা এক প্রার্থীর প্রত্যয়নে সই করেছেন চন্দনাইশ থানা আওয়ামী লীগের এক নেতা। এভাবে অধিকাংশ প্রার্থির আবেদনপত্রের সঙ্গে সরকারি দলের এমপিদের ডিও অথবা নেতাদের প্রত্যয়নপত্র সংযুক্ত করা হচ্ছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চিঠি দিয়ে শূন্যপদের হিসাব নেন। এরপর নতুন করে পদ সৃষ্টির সুযোগ আছে কিনা সে ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। শূন্যপদে দলীয় লোকদের নিয়োগ দিতে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে সারা দেশের কর্মীদের বায়োডাটা সংগ্রহ করা হয়। এরপর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি শূন্যপদ পূরণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কয়েকবার চিঠি দিয়ে শূন্যপদ পূরণের তাগাদা দেয়া হয়।
ডিও লেটারের বাইরে যোগ্যদের চাকরি দিতে গিয়ে বিপত্তি ঘটেছে কোনো কোনো বিভাগে। খাদ্য বিভাগ, রেল বিভাগ, সিভিল সার্জন অফিসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ পর্যন্ত করতে হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে মন্ত্রীকে সংসদে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল। সংসদ অধিবেশন শেষে সরকারি দলের এক সংসদ সদস্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়কমন্ত্রী ডা. আফছারুল আমীনের সচিবালয় কার্যালয়ে যান এবং তার সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, বর্তমান সরকারের সময় স্বাস্থ্য খাতে দলীয়করণ উন্মুক্ত করা হয়েছে। এখানে রাজনৈতিক ডিও লেটার ছাড়া নিয়োগ হওয়ার রেকর্ড নেই বললেই চলে। দলীয় লোকদের নিয়োগ ও পদায়নের জন্য দেশের স্বনামধন্য মেডিকেল কলেজগুলো থেকে মেধাবী ডাক্তারদের সরিয়ে দেয়া হয়েছে। সেখানে স্থান দেয়া হয়েছে দলীয় ক্যাডার বলে পরিচিত ডাক্তারদের। ফলে ঢাকা মেডিকেল, সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সার মান নিম্নগামী হতে চলেছে। দেশের ৬৪ জেলায় সিভিল সার্জন পদে দলীয় ক্যাডারদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আবার স্বাস্থ্য খাতে নিয়োগ মনোপুত না হওয়ায় এসব সিভিল সার্জনের অনেকেই লাঞ্ছিত হয়েছেন স্থানীয় এমপির ক্যাডারদের হাতে। সংসদ সদস্যদের ডিও অনুযায়ী চাকরি না দেয়ায় যশোর, ঝিনাইদহ, পঞ্চগড়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে হামলা ও ভাংচুর চালানো হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ডা. প্রাণগোপাল দত্ত দু’বার লাঞ্ছিত হয়েছেন। পদের চেয়ে ডিও লেটার বেশি হওয়ায় অনেককে চাকরি দিতে পারেননি সিভিল সার্জনরা। কিন্তু এটা মানতে চাননি সংসদ সদস্যরা।
নিয়োগ ও বদলিবাণিজ্য নিয়ে পাবনায় প্রশাসনের সঙ্গে দলীয় লোকদের বিরোধের ঘটনা এ সরকারের জন্য রেকর্ড হয়ে থাকবে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের দ্বন্দ্বে জেলা প্রশাসনের তৃতীয় শ্রেণীর ১৭টি পদে নিয়োগ বন্ধ হয়। ভাংচুর চালানো হয়— এমনকি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নির্মমভাবে পেটানো হয়। দুই নেতার ক্যাডাররা কেন্দ্র ভাংচুর, লুটতরাজ ও মারধর এবং প্রশ্ন ও উত্তরপত্র পুড়িয়ে ফেলেছিল।
আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিচার বিভাগে বিভিন্ন ধরনের নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয়করণের নজিরবিহীন স্বাক্ষর রেখেছে। বিচারপতি থেকে শুরু করে যারাই নিয়োগ পেয়েছেন, সবাই আওয়ামী ঘরানার। ঢাকা জেলা দায়রা জজ নিয়োগ নিয়েও নগ্ন দলীয়করণ হয়েছে। অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে ২০৫ জেলা জজকে ডিঙিয়ে একজনকে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে নিয়োগ দেয়ার প্রস্তাব করে আইন মন্ত্রণালয়। শুধু দলীয় আনুগত্যের কারণেই এ সুপারিশ করা হয়। তিনি নিয়োগও পান। একইভাবে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন সাবরেজিস্ট্রার ও পিপি, এপিপি নিয়োগ দেয়া হয়েছে দলীয় ক্যাডার বিবেচনায়।
বিমান মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এখানে গত দুই বছরের সব নিয়োগ হয়েছে দলীয় বিবেচনায়। গত বছর বাংলাদেশ বিমানে ৮২ কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এদের মূল পরিচয় আওয়ামী লীগ। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ৮২ জনের মধ্যে ৪৮ জনের বাড়ি গোপালগঞ্জ। আবার এই ৪৮ জনের মধ্যে ১৮ জনের বাড়ি টুঙ্গিপাড়ায়। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে পাঠানো তালিকা ধরে এদের চাকরি দেয়া হয়।
স্কুল কলেজে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক ডিওকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি ঐতিহ্যবাহী ভিকারুননিসা নূন স্কুলে ৭ শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে। এরা হলেন পরিমল জয়ধর, বরুণ চন্দ্র বর্মণ, বাবুর কর্মকার, প্রণব ঘোষ, বিষ্ণু চন্দ্র, বিশ্বজিত্ ও রমেন্দ্র নাথ। এদের সবার বাড়ি গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুরে। এদের মধ্যে ৪ জনের বিরুদ্ধে ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। একজন শিক্ষক এখন জেল খাটছেন।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সারাদেশে ১০৫০টি পদে খাদ্য পরিদর্শক, উপ-খাদ্য পরিদর্শক ও সহকারী খাদ্য পরিদর্শক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। জানা গেছে, সেখানে দলীয় পরিচয় মূল বিবেচনায় আনা হয়েছে। তারপরও অধিকাংশ প্রার্থীকে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা ঘুষ গুনতে হয়েছে।
No comments:
Post a Comment