২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ও গ্রেনেড সরবরাহকারী জঙ্গি মাওলানা তাজউদ্দিনকে বিদেশে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেন তিন সেনা কর্মকর্তা। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের নির্দেশেই এই সহযোগিতা করেন তাঁরা। আর ওই জঙ্গিকে বিদেশে পাঠানোর ঘটনা জানতেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের দুটি মামলার সম্পূরক অভিযোগপত্র (চার্জশিট) থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
দুটি মামলার অধিকতর তদন্ত শেষে গত ৩ জুলাই পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহ্হার আকন্দ সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করেন আদালতে। অভিযোগপত্রে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপির সংসদ সদস্য শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদসহ ৩০ জনকে নতুন করে আসামি করা হয়েছে।
খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, ডিউকের ভায়রা ডিজিএফআইয়ের সিটিআইবির জিএসও-১ লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বর্তমানে বরখাস্ত) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার, সিটিআইবির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল) এ টি এম আমিনকেও আসামি করা হয়েছে সম্পূরক অভিযোগপত্রে। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে সাইফুল ইসলাম ডিউক ছিলেন তাঁর পিএস-২।
সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরকে ২১ আগস্টের ঘটনার পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করার পাশাপাশি মাওলানা তাজউদ্দিনকে রক্ষা করতে তাঁকে বিদেশ পাঠানোর অপরাধেও অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, সাবেক তিন সেনা কর্মকর্তা পরস্পর যোগসাজশে তাজউদ্দিনকে বিদেশ পাঠানোর সব ব্যবস্থা করেন।
চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিকে ২০০৬ সালের ১০ অক্টোবর বাদল নামে পাসপোর্ট নিয়ে পাকিস্তানে যান তাজউদ্দিন। আর জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে বিমানে তুলে দিতে সহযোগিতা করেন ওই তিন সাবেক সেনা কর্মকর্তা।
জঙ্গি তাজউদ্দিনকে বিদেশে পাঠানোর বিষয়টি সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিভাবে জানতেন এর বিস্তারিত বর্ণনা নেই সম্পূরক অভিযোগপত্রে। তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন, 'মূল পরিকল্পনাকারী (২১ আগস্ট ঘটনার) সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের নির্দেশে ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর জ্ঞাতসারে ২১ আগস্ট ২০০৪-এর অন্যতম পরিকল্পনা ও গ্রেনেড সরবরাহকারী মাওলানা তাজউদ্দিনকে সাইফুল ইসলাম ডিউক, সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার এবং এ টি এম আমিন পরস্পর যোগসাজশে মূল অপরাধীদের রক্ষাকল্পে বাদল নামীয় পাসপোর্ট দ্বারা তৎকালীন জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়া পাকিস্তানে পাঠাইয়া দেন।'
মাওলানা তাজউদ্দিন জোট সরকারের আমলের সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই। অভিযোগপত্রে উল্লেখ আছে, তাজউদ্দিন পাকিস্তানের মাদ্রাসায় পড়াশোনা করার সময় কাশ্মীরভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা, তেহরিক-ই জিহাদ আল ইসলাম ও হিজবুল মুজাহিদিনের সঙ্গে জড়িত হন। তাঁর সঙ্গে জোট সরকার আমলে লুৎফুজ্জামান বাবরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার নেতা এ মামলার অভিযোগপত্র ভুক্ত আসামি মাজেদ ভাটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তাজউদ্দিনের। পাকিস্তান থেকে তৈরি করা গ্রেনেড বাংলাদেশের মাধ্যমে ভারতের কাশ্মীরে জঙ্গিদের কাছে পাচার হতো। ওই পাচারকাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন মাওলানা তাজউদ্দিন ও মুফতি হান্নান। ওখান থেকে এক কার্টন গ্রেনেড রেখে দেন তাজউদ্দিন। ওই গ্রেনেডই শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে জঙ্গিদের সরবরাহ করেন তিনি।
তাজউদ্দিন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য জঙ্গিদের সব বৈঠকে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ধানমণ্ডিতে তাঁর ভাই আবদুস সালাম পিন্টুর বাসায় জঙ্গিদের বৈঠকেও উপস্থিত ছিলেন তিনি। এমনকি হাওয়া ভবনের বৈঠকেও তিনি উপস্থিত ছিলেন।
তাজউদ্দিন এর আগেও শেখ হাসিনাকে হত্যার কাজে গ্রেনেড সরবরাহ করেন। মুফতি হান্নান গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর স্বীকারোক্তি থেকে এসব তথ্য পাওয়া যায়। পরে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জমান বাবর তড়িঘড়ি করে তাঁকে বিদেশ চলে যেতে বলেন বলে জানা যায়। তাজউদ্দিনের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়া গেলেও জনশ্রুতি রয়েছে, তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় রয়েছেন।
তাজউদ্দিনের পাসপোর্ট-সংক্রান্ত কাগজপত্র ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার সম্পূরক অভিযোগপত্রের সঙ্গে আলামত হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। জব্দ করা ওই সব আলামত থেকে দেখা যায়, ওই পাসপোর্টটি ইস্যু হয় রাজশাহীর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে। ২০০১ সালের ১২ মার্চ মো. বাদল নামে মাওলানা তাজউদ্দিন রাজশাহীতে পাসপোর্টের আবেদন করেন। একই বছরের ৩ জুলাই বাদলের নামে পাসপোর্ট ইস্যু হয়। ওই পাসপোর্টে তাজউদ্দিন নিজের ছবি ব্যবহার করেন। গায়ে পাঞ্জাবি, মাথায় সাদা গোলটুপি ও মুখে দাড়ি-সংবলিত ছবি পাসপোর্টের জন্য জমা দেওয়া হয়। পাসপোর্টে বাবার নাম ডা. মহিউদ্দিন ঠিক রাখা হলেও ঠিকানা উল্লেখ রয়েছে হেতমখাঁ, পো.-ঘোড়ামারা, থানা-বোয়ালিয়া, জেলা-রাজশাহী। ভারতে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যাওয়ার জন্য এই আন্তর্জাতিক বিশেষ পাসপোর্টের আবেদন করা হয়েছিল। আবেদনপত্রে জন্ম তারিখ লেখা ছিল ১৯৭৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি।
জব্দ করা পাসপোর্টের কাগজপত্র থেকে আরো জানা যায়, আবেদনকারীর ঠিকানার পিপিআর ফরমে (ছবিসহ) রাজশাহী নগর বিশেষ শাখার (সিটিএসবি) উপপুলিশ কমিশনার পাসপোর্ট দেওয়া যেতে পারে বলে অনাপত্তিপত্র দিয়েছিলেন। পাসপোর্টের আবেদনপত্রের দুটি পাতায় ডা. আজিজুল হক নামের এক কর্মকর্তা সত্যায়িত করেছিলেন।
আশরাফ-উল-আলম
সূত্র:কালেরকণ্ঠ, ১১/০৭/২০১১
No comments:
Post a Comment