- মেঠোপথ নয়, মহাসড়ক। দুরবস্থা দেখতে মন্ত্রী গেলেন দামি গাড়িতে করে, নামলেন না। গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা থেকে তোলা ছবিসাজিদ হোসেন
অর্থের অভাবে সড়ক সংস্কার করা যাচ্ছে না—যোগাযোগমন্ত্রীর এ বক্তব্য ঠিক নয়। আসলে অর্থ বরাদ্দ থাকলেও কাজ করেনি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। গতকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই অভিমত ব্যক্ত করা হয়। বৈঠক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
যোগাযোগমন্ত্রী কয়েক দিন ধরে অভিযোগ করছিলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় করছে না বলে রাস্তাঘাটের মেরামতকাজ করা যাচ্ছে না। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গতকাল এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, যোগাযোগ-মন্ত্রী না বুঝেই এসব কথা বলেছেন।
বৈঠক সূত্র জানায়, গতকালের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঈদের আগেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে রাস্তাঘাট যানবাহন চলাচলের উপযোগী করার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
‘বরাদ্দ করা অর্থ আগে খরচ করেন। প্রয়োজনে আরও অর্থ সরকার দেবে।’ রাস্তা সংস্কারের জন্য যত টাকা প্রয়োজন, তা দ্রুত ছাড় করার জন্য তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন।যোগাযোগমন্ত্রী কয়েক দিন ধরে অভিযোগ করছিলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় করছে না বলে রাস্তাঘাটের মেরামতকাজ করা যাচ্ছে না। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গতকাল এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, যোগাযোগ-মন্ত্রী না বুঝেই এসব কথা বলেছেন।
বৈঠক সূত্র জানায়, গতকালের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঈদের আগেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে রাস্তাঘাট যানবাহন চলাচলের উপযোগী করার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
২১ আগস্ট থেকে ঢাকা-রংপুরে যাত্রীবাহী বিশেষ এক্সপ্রেস ট্রেন চালু করার সিদ্ধান্ত হয় বৈঠকে। মালামাল বহনের জন্য এই ট্রেনে আলাদা বগি দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ঈদের আগে প্রতি রুটে ট্রেনের সংখ্যা দ্বিগুণ এবং সড়কপথে বিআরটিসির ৩০০ বাস চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৈঠক সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম প্রথম আলোকে বলেন, বৈঠক থেকে রাস্তাঘাট জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যত টাকা লাগে, তা দেওয়া হবে। রাস্তা সচল করতে হবে। যোগাযোগ খাতের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পও দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থ উপদেষ্টা মসিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বাজেটে যা বরাদ্দ আছে, তা তাড়াতাড়ি খরচ করতে বলা হয়েছে। রাস্তা মেরামত ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এর বেশি লাগলে তা-ও দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক ও রেল যোগাযোগ খাতের উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয় এ বৈঠকে। সকাল সাড়ে ১০টায় বৈঠক শুরু হয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা চলে। প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, অর্থ উপদেষ্টা মসিউর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব এম এ করিম, সচিব মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামান, অর্থসচিব মোহাম্মদ তারেক, যোগাযোগসচিব মোজাম্মেল হক খান, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে সড়কপথের মেরামত বাবদ ৬৯০ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন খাতে এক হাজার ৮২৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু ওই টাকা থেকে মেরামত বাবদ কোনো অর্থ ব্যয় করা হয়নি; এমনকি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে অর্থ ছাড় করার অনুরোধও করা হয়নি।
জানতে চাইলে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ ৬৯০ কোটি টাকা ছাড়ের জন্য আজ অর্থ মন্ত্রণালয়কে বলা হবে। যেসব রাস্তায় বেশি গাড়ি চলাচল করে, তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মেরামত করা হবে।’ ঈদের আগেই রাস্তা মেরামতের কাজ শেষ করা হবে বলে তিনি জানান।
বাজেটে বরাদ্দ থাকার পরও কেন রাস্তাঘাট মেরামত করতে পারলেন না—জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘টাকা খরচের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতির প্রয়োজন হয়।’ আপনি টাকা ছাড়ের সম্মতি চেয়েছিলেন? এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে আবুল হোসেন বলেন, বৃষ্টির মধ্যে তো কাজ করতে সমস্যা হয়। উন্নয়নকাজের জন্য রোদ ও খরা লাগে।
যখন রোদ ছিল, তখন সংস্কারকাজ করেননি কেন? যোগাযোগমন্ত্রীর জবাব, তখন তো রাস্তাঘাট এত খারাপ ছিল না। বৃষ্টির জন্য এই সমস্যা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থের সমস্যা মিটেছে কি না—জানতে চাইলে সৈয়দ আবুল হোসেন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আশা করছি, সমস্যা মিটে গেল।’
বৈঠক সম্পর্কে আবুল হোসেন বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম আছে। তবে আগামী পর্যালোচনা বৈঠকের আগে বরাদ্দের টাকা স্বচ্ছতার সঙ্গে খরচ করতে পারলে নতুন করে টাকা দেওয়া হবে। পর্যালোচনা বৈঠক কবে হবে—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে হবে।
সূত্র জানায়, বৈঠকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, সারা দেশে ৩৫০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, ৫৩০ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক ও এক হাজার ৫০০ কিলোমিটার জেলা পর্যায়ের সড়ক গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন প্রকল্পে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সড়ক ও জনপথ, বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিবিকে দুই হাজার ২৪৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে; এর মধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের জন্য বরাদ্দ এক হাজার ৮২৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এই টাকার মধ্যে সরকার থেকে এক হাজার ৫০ কোটি ১৩ লাখ ও প্রকল্প সহায়তা থেকে ৭৭৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। আর সড়ক মেরামত বাবদ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬৯০ কোটি টাকা।
প্রেস সচিবের বক্তব্য: বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, ঈদে মানুষের চলাচলে যেন কোনো রকম কষ্ট না হয়, সে জন্য সব সড়ক সংস্কারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত সব সড়ক চলাচলের উপযোগী করতে হবে। ঢাকা থেকে সব জেলায় বিআরটিসির বাস চালুরও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। রাস্তার সংস্কারে প্রয়োজনীয় অর্থ দেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে তিনি নির্দেশ দেন।
এ ছাড়া বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে রক্ষণাবেক্ষণ না করার জন্যই ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কসহ বিভিন্ন সড়কের খারাপ অবস্থা বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়।
আবুল কালাম আজাদ জানান, গত চারদলীয় জোট সরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও বর্তমান সরকারের সময়ে, অর্থাৎ ২০০১ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত যোগাযোগ খাতে যে ব্যয় হয়েছে (নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ), তার বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেওয়ার জন্যও বৈঠকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
অর্থমন্ত্রীর দ্বিমত: যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে অর্থ ছাড় দেওয়া বা না দেওয়া প্রসঙ্গে যোগাযোগমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। যোগাযোগ উন্নয়নে অর্থ মন্ত্রণালয় বরাদ্দ দিলেও প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় করছে না—আবুল হোসেনের এমন অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এটা উনি না বুঝেই বলেছেন।’
গতকাল মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে ২০১২ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় বিশ্ব আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক ফোরামের আয়োজন-সম্পর্কিত আন্তমন্ত্রণালয়ের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এমন মন্তব্য করেন।
অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী জি এম কাদেরসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবেরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমি এখন আর কোনো কথা বলব না। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ নিয়ে জরুরি বৈঠক চলছে। সেখান থেকেই বিস্তারিত জানানো হবে।
No comments:
Post a Comment