Wednesday, August 24, 2011

বিদ্রোহীদের দখলে গাদ্দাফির প্রাসাদ


বাব আল আজিজিয়া প্রাসাদের ভেতরে মঙ্গলবার রাতে গাদ্দাফির প্রতিকৃতির ওপর পা রেখে দাঁড়িয়ে আছেন এক বিদ্রোহী যোদ্ধা বিবিসি

অবশেষে চূড়ান্ত পতন ঘটেছে লিবিয়ার ৪২ বছরের একনায়ক কর্নেল মুয়াম্মার আল গাদ্দাফির। ত্রিপোলিতে গাদ্দাফির শাসনের শেষ দুর্গ সুরম্য বাব আল আজিজিয়া প্রাসাদ দখল করে নিয়েছে বিদ্রোহী যোদ্ধারা। মার্কিন বাহিনীর বাগদাদ দখলের পর উল্লসিত ইরাকি জনগণ যেমন সাদ্দাম হোসেনের প্রতিকৃতি ধ্বংসের উৎসবে মেতেছিল, তেমনি গতকাল সন্ধ্যায় বাব আল আজিজিয়া দখল করে গাদ্দাফির প্রতিকৃতি ধ্বংস করেছে বিদ্রোহী যোদ্ধারা। দিনভর তুমুল লড়াইয়ের পর গতকাল স্থানীয় সময় বিকেলে ৬ বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিশাল সুরক্ষিত প্রাসাদের পশ্চিম দিকের প্রধান গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে তারা। কিছুক্ষণের মধ্যে শত শত যোদ্ধা ঢুকে পড়ে প্রাসাদ কম্পাউন্ডে। তবে প্রাসাদের ভেতরে গাদ্দাফি কিংবা তার পরিবারের সদস্যরা ছিলেন কি-না জানা যায়নি। প্রাসাদের দখল ধরে রাখতে বিদ্রোহীদের কমান্ডার কর্নেল আহমেদ ওমর বানি বলেছেন, গাদ্দাফি ও তার পুত্রদের প্রাসাদে পাওয়া যায়নি। দিনভর প্রাণপণ যুদ্ধ করা গাদ্দাফি বাহিনীর ভাগ্যে কী ঘটেছে তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। এ অবস্থায় বিদ্রোহীদের অন্তর্বর্তী সরকার হিসেবে পরিচিত ন্যাশনাল ট্রান্সমিশনাল কাউন্সিল (এনটিসি) খুব শিগগিরই বেনগাজি থেকে ত্রিপোলিতে আসছে। লিবিয়ার শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করতে যাচ্ছে নতুন সরকার। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন বলেছে, আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পুরো ত্রিপোলি বিদ্রোহী যোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে আসবে।
এর আগে গতকাল সকালে বাব আল আজিজিয়া প্রাসাদের সামনে ক্ষণিকের জন্য জনসমক্ষে এসে গাদ্দাফিপুত্র সাইফ আল ইসলাম গাদ্দাফি সদম্ভে বলেছিলেন, বিদ্রোহীদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ত্রিপোলি পুরোপুরি গাদ্দাফি সরকারের নিয়ন্ত্রণে। বিদ্রোহীদের ফাঁদে ফেলার জন্যই কৌশলে ত্রিপোলিতে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই প্রাসাদ বিদ্রোহীদের দখলে যাওয়ার পর তার দম্ভোক্তি অর্থহীন বলে প্রমাণ হয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রত্যক্ষদর্শী
সংবাদদাতা জানান, 'বিদ্রোহী যোদ্ধারা সিমেন্টের প্রাচীর ভেঙে প্রাসাদের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। তারা বাব আল আজিজিয়ার পুরোপুরি দখল নিয়েছে। খেলা শেষ হয়ে গেছে। এটা এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য।' সংবাদদাতা আরও জানান, অনেক মৃতদেহ ভেতরে পড়ে আছে। অনেক আহত ব্যক্তিও কাতরাচ্ছিলেন। দৃশ্যত তারা সবাই গাদ্দাফি বাহিনীর সদস্য। এর কয়েক মিনিট আগে বিদ্রোহী যোদ্ধাদের মুখপাত্র কর্নেল আহমেদ ওমর বানি বেনগাজি থেকে জানান, আমাদের বাহিনী বাব আল আজিজিয়া ঘিরে রেখেছে। সেখানে প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে। আমরা এখন প্রাসাদটির পশ্চিম দিকের গেট নিয়ন্ত্রণ করছি। এএফপির সংবাদদাতা জানান, বিদ্রোহী যোদ্ধারা প্রাসাদের ভেতরের অস্ত্রভাণ্ডার থেকে বেশ কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ কব্জা করেছে। প্রাসাদের ভেতরে ঢুকে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই উল্লসিত বিদ্রোহী যোদ্ধারা গাদ্দাফির ব্রোঞ্জ নির্মিত বিশাল প্রতিকৃতি ধ্বংস করে এবং আকাশে ফাঁকা গুলি ছুড়ে বিজয় উদযাপন করে। তবে গাদ্দাফির বাব আল আজিজিয়া প্রাসাদ দখলে নিলেও ত্রিপোলির কিছু এলাকায় এখন প্রতিরোধ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তার অনুগত বাহিনী। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ ত্রিপোলির রিক্সস হোটেল এলাকা।
গতকাল সকালে বাব আল আজিজিয়ার সামনে জনসমক্ষে আসার পর সেখান থেকে নিকটবর্তী এই হোটেলে গিয়ে ওঠেন গাদ্দাফিপুত্র সাইফ। পরে বিকেলে সেখানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথাও বলেন। তিনি এখনও রিক্সস হোটেলে আছেন কি-না জানা যায়নি। গাদ্দাফির শাসনের শেষ প্রতীক বাব আল আজিজিয়া রক্ষায় কয়েকশ' এলিট সেনা সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকলেও বিদ্রোহী যোদ্ধারা ভেতরে ঢুকে তেমন প্রতিরোধের মুখে পড়েনি। জানা গেছে, বাব আল আজিজিয়ার অভ্যন্তরে রয়েছে বেশ কয়েকটি সুড়ঙ্গ পথ। সেগুলোর সংযোগ রয়েছে ত্রিপোলির বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থানের সঙ্গে। গত কয়েকদিন ধরে শোনা যাচ্ছিল, গাদ্দাফি এই প্রাসাদের ভেতরে গভীর বাঙ্কারে আত্মগোপন করেছেন। তবে এখন গাদ্দাফি ও তার পরিবারের সদস্যরা কোথায় আছেন, তা পরিষ্কার নয়। প্রাসাদটির ভেতরে রয়েছে বেশ কয়েকটি সামরিক ভবন, গাদ্দাফির মূল বাসস্থান এবং লাইব্রেরি ও বেশকিছু সরকারি দফতর। ত্রিপোলিতে বিবিসির সংবাদদাতা রানা জাওয়াদ জানান, এখন আসলেই মনে করা হচ্ছে গাদ্দাফির শাসনের অবসান হয়েছে। কিন্তু গাদ্দাফি ও তার পরিবারের সদস্যদের খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত প্রকৃত বিজয় উদযাপন হচ্ছে না। ত্রিপোলি যুদ্ধে বিদ্রোহীদের কমান্ডার আবদেল হাকিম বেলহাজ বিজয় ঘোষণা করে বলেন, গাদ্দাফি ও তার ঘনিষ্ঠজনরা ইঁদুরের মতো পালিয়েছে। আল জাজিরা টেলিভিশনকে তিনি আরও বলেন, সামরিক যুদ্ধ শেষ। গাদ্দাফির বাব আল আজিজিয়া প্রাসাদের ৯০ শতাংশ এলাকা এরই মধ্যে নিরাপদ করা হয়েছে। তবে ত্রিপোলিতে এখনও প্রতিরোধের কিছু পকেট রয়ে গেছে।

প্রাসাদের ভেতরের দৃশ্যপট
আল জাজিরা টেলিভিশনে দেখা যায়, এক তরুণ যোদ্ধা প্রাসাদের ভেতরে একটি বিমানকে হাতের মুঠোয় ধরে রাখা অবস্থায় ব্রোঞ্জে তৈরি বিশাল প্রতিকৃতির ওপর উঠে সেটি ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। প্রতিকৃতিটি হচ্ছে ১৯৮৬ সালে এই প্রাসাদ কম্পাউন্ডে মার্কিন হামলার প্রতীক, যাকে হাতের মুঠোয় চেপে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সময় গভীর রাতে সিএনএন জানায়, বিদ্রোহী যোদ্ধারা সাংবাদিকদের প্রাসাদের অভ্যন্তরে আমন্ত্রণ জানিয়ে বলে, এসে দেখুন আমরা কী করছি। তবে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, তারা এখনও আশঙ্কা করছেন গাদ্দাফি রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন মুখপাত্র কর্নেল ডেভিড ল্যাপান জানান, আমরা গাদ্দাফির রাসায়নিক অস্ত্র মনিটর করে আসছি এবং তা অব্যাহত থাকবে।
এদিকে বিদ্রোহীরা প্রাসাদের ভেতরে ঢুকে কম্পাউন্ডের একটি ঐতিহাসিক ভবনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এর আগে গতকাল স্থানীয় সময় বিকেলে বাব আল আজিজিয়া প্রাসাদে বেশক'টি প্রচণ্ড বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ধারণা করা হচ্ছে, ন্যাটোর জঙ্গি বিমান প্রাসাদে হামলা চালানোর পর এ বিস্ফোরণ ঘটেছে। বিস্ফোরণের পর প্রাসাদ থেকে আকাশে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। এর আগে বিদ্রোহী যোদ্ধারা গতকাল ত্রিপোলির একটি বিমানবন্দরও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। গতকাল গভীর রাতে আল আজিজিয়ার ভেতরে স্বর্ণখচিত একটি রাইফেল জব্দ করে তারা জানায়, গাদ্দাফির লোকেরা এটা দিয়ে আমাদের (লোকদের) হত্যা করেছে। অন্যদিকে বাব আল আজিজিয়া প্রাসাদ বিদ্রোহীদের দখলে যাওয়ার পর ত্রিপোলির শত শত মানুষ রাতেও প্রাসাদের দিকে ছুটে আসে। তবে বিদ্রোহীদের টেলিভিশন আল আহরার জনতাকে প্রাসাদ থেকে দূরে থাকতে আহ্বান জানায়, যেন যোদ্ধারা গোটা প্রাসাদ নিরাপদ করতে সক্ষম হয়। প্রাসাদের অভ্যন্তরে উৎফুল্ল তরুণ যোদ্ধারা সাংবাদিকদের বলেছে, লিবীয়দের জন্য আজ এক মহাআনন্দের দিন। আমাদের নবযাত্রা শুরু হলো।

গাদ্দাফির চূড়ান্ত পতন
বাব আল আজিজিয়া প্রাসাদ বিদ্রোহীদের দখলে আসার পর এক বিবৃতিতে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ বলেন, মুয়াম্মার গাদ্দাফির সরকার পতনের চূড়ান্ত ধাপে পেঁৗছেছে। তিনি বলেন, স্পষ্টত এটা অব্যাহত সাফল্য। এতে প্রমাণ হয়, গাদ্দাফি সরকার মৃত্যু-যন্ত্রণায় পড়েছে। লিবীয় জনগণের জন্য এটা বিরাট সাফল্য। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি বলেন, গাদ্দাফি অস্ত্র ত্যাগ না করা পর্যন্ত ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান অব্যাহত থাকবে। এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার সঙ্গে একমত হয়েছেন। সারকোজির প্রাসাদ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, 'আজ প্রেসিডেন্ট (সারকোজি) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ টেলিফোনে কথা বলেছেন। এ সময় বিদ্রোহীদের অপেক্ষমাণ সরকার ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের সাফল্যের প্রশংসা করেছেন তারা।' ইতালির প্রধানমন্ত্রী ফ্রাঙ্কো ফ্রাত্তিনি বলেন, গাদ্দাফি ও তার পুত্রদের শিগগিরই ধরা হবে এবং তাদের আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আদালতে বিচার হওয়া উচিত।
ত্রিপোলিতে আসবে এনটিসি
বিদ্রোহীদের অন্তর্বর্তী সরকার (এনটিসি) আজকের মধ্যেই বেনগাজি থেকে তাদের সদর দফতর সরিয়ে ত্রিপোলিতে আনার পরিকল্পনা করছে। এনটিসি বলেছে, ত্রিপোলি বিমানবন্দরের পুরো নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পর নতুন সরকার গঠনের কাজ করতেই ত্রিপোলি আসবেন তিনি। এনটিসির চেয়ারম্যান গাদ্দাফির সাবেক বিচারমন্ত্রী মোস্তফা আবদেল জলিল বলেন, গাদ্দাফি ও তার সহযোগীদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। বেনগাজিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিদ্রোহী যোদ্ধাদের সংযত থাকতে এবং আইন হাতে তুলে না নিতে আহ্বান জানান।

No comments:

Post a Comment