Saturday, August 27, 2011

পুলিশ হেফাজতে অসুস্থ, ১৫ দিন পর হাসপাতালে মৃত্যু


  • রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে শোকে নিথর এম ইউ আহমেদের স্ত্রী ও ছোট ছেলে
    রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে শোকে নিথর এম ইউ আহমেদের স্ত্রী ও ছোট ছেলে
    ছবি: প্রথম আলো
  • এম ইউ আহমেদের মরদেহ দেখতে গেলে বিক্ষোভের মুখে পড়েন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। পরে পুলিশি পা
    এম ইউ আহমেদের মরদেহ দেখতে গেলে বিক্ষোভের মুখে পড়েন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। পরে পুলিশি পাহারায় তিনি স্কয়ার হাসপাতাল ত্যাগ করেন
    প্রথম আলো
হাইকোর্টে হট্টগোলের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া বিএনপি-সমর্থক আইনজীবী মমতাজ উদ্দিন আহমেদ (৫০) মারা গেছেন। 

গতকাল শুক্রবার বেলা একটা ১০ মিনিটে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই আইনজীবীর মৃত্যু হয়। তাঁর স্ত্রী, বিএনপি ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতির অভিযোগ, গ্রেপ্তারের পরপর পুলিশের নির্যাতনের কারণে এম ইউ আহমেদ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এ কারণেই তিনি মারা গেছেন।
এই মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরপরই বিএনপি-সমর্থক আইনজীবীরা স্কয়ার হাসপাতালের সামনে জড়ো হন। তাঁরা সেখানে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। 
এই ঘটনায় বিএনপি ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
হাসপাতালে মরদেহ দেখতে গিয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রফিক-উল হক সাংবাদিকদের বলেন, এম ইউ আহমেদের মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। পুলিশ অনেক কিছুই করতে পারে। দেশের মানুষ এখন বুঝতে পেরেছে, দেশ কোন দিকে যাচ্ছে। তিনি এই ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত কোনো বিচারপতি দিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি করেন। 
২ আগস্ট বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে মুফতি ফজলুল হক আমিনীর সংবিধান ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে দেওয়া-সংক্রান্ত বক্তব্যের বিরুদ্ধে শুনানি হয়। ওই শুনানিতে একই ধরনের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে আদালত খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুললে এজলাসে উপস্থিত আইনজীবীদের মধ্যে হট্টগোল ও হাতাহাতি হয়।
এই ঘটনায় পুলিশ ওই রাতেই ১৪ আইনজীবীসহ অজ্ঞাতনামা ৩০-৪০ জনের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা করে। হাইকোর্টে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করা এই মামলায় গত ১১ আগস্ট আইনজীবী এম ইউ আহমেদকে তাঁর সেগুনবাগিচার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। 
ডিবির দাবি অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তাঁকে প্রথম ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, পরে জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সিসিইউতে ভর্তি করা হয়। 
তখন বলা হয়েছিল, এম ইউ আহমেদের রক্তচাপ ও হূৎস্পন্দন কমে যাওয়ায় তাঁর অবস্থার অবনতি হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন উপসর্গ যোগ হওয়ায় তাঁর কিডনিও কাজ করছিল না। এরপর ১৬ আগস্ট পুলিশের পাহারায় তাঁকে স্কয়ার হাসপাতালের সিসিইউতে ভর্তি করা হয়। তাঁর স্ত্রীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ১৭ আগস্ট এম ইউ আহমেদের জামিন মঞ্জুর করেন। এরপর হাসপাতালে তাঁর কক্ষ থেকে পুলিশের পাহারা সরিয়ে নেওয়া হয়।
গতকাল শুক্রবার বেলা একটা ১০ মিনিটে এম ইউ আহমেদ মারা যান। তাঁর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে স্কয়ার হাসপাতালে এম ইউ আহমেদকে তত্ত্বাবধানকারী চিকিৎসক আবদুল্লাহ আল জামিল প্রথম আলোকে বলেন, তিনি এম ইউ আহমেদকে হূদেরাগে আক্রান্ত অবস্থায় পেয়েছেন। তাঁর রক্তচাপ খুব কমে যায়। সেটা গত সাত দিনেও স্বাভাবিক হয়নি। তাঁর হূৎস্পন্দন স্বাভাবিক ছিল না। এ ছাড়া তিনি ক্রনিক ব্রংকাইটিসে ভুগছিলেন, ফুসফুসও কাজ করছিল না। এসব বিভিন্ন জটিলতা যুক্ত হয়ে তিনি মারা যান। 
লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে গতকাল সন্ধ্যা পৌনে সাতটায় এম ইউ আহমেদের মরদেহ বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে নিয়ে রাখা হয়। 
জানাজা ও দাফন: সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন প্রথম আলোকে বলেছেন, আজ শনিবার সকালে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে মরহুমের জানাজা হবে। সেখান থেকে শোক মিছিলসহ লাশ জাতীয় প্রেসক্লাবে নেওয়া হবে। এরপর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দ্বিতীয় দফায় জানাজা শেষে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।
স্বজনেরা জানিয়েছেন, আজই বগুড়ার শেরপুর উপজেলার বোয়ালকান্দি গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে এম ইউ আহমেদের লাশ দাফন করা হবে। 
বিক্ষোভ ও বিচার দাবি: এদিকে এম ইউ আহমেদের মৃত্যুর খবর জানাজানির পরপরই গতকাল স্কয়ার হাসপাতালে তাঁর স্বজন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা ও আইনজীবীরা জড়ো হন। তাঁদের অনেকেই এম ইউ আহমেদের স্ত্রী সেলিনা আহমেদকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে আইনজীবীরা স্কয়ার হাসপাতালের সামনের সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেন। 
বিক্ষোভ-সমাবেশে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এর দায় সরকারকে নিতে হবে। পুলিশি নির্যাতনের পর আদালত এম ইউ আহমেদের সুচিকিৎসার নির্দেশ দিলেও রাষ্ট্র তা মানেনি। সরকার বিদেশে পাঠিয়ে চিকিৎসা করালে এম ইউ আহমেদের জীবন রক্ষা পেত। 
খন্দকার মাহবুব বলেন, হত্যাকাণ্ডের জন্য দোষী পুলিশ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 
শোকাহত সেলিনা আহমেদ প্রথম আলোর কাছে অভিযোগ করেন, তাঁর স্বামীকে সুস্থ অবস্থায় গ্রেপ্তার করে ডিবি হেফাজতে চার ঘণ্টা নির্যাতন করা হয়েছে। এতে তাঁর স্বামী সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। তিনি বলেন, হূদরোগ ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়ার দুই দিন পর এম ইউ আহমেদের একবার জ্ঞান ফিরে এসেছিল। তখন তিনি স্ত্রীকে ডিবি কার্যালয়ে মারধর ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার কথা বলেছিলেন।
সেলিনা আহমেদ তাঁর স্বামীর নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ডিবি পুলিশ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ফাঁসি দাবি করেন। তিনি দাবি করেন, তাঁর স্বামীর বাঁ হাতে বৈদ্যুতিক শকের চিহ্ন রয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, এম ইউ আহমেদকে গ্রেপ্তার বেআইনি ছিল। তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। পুলিশের নির্যাতনের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। 
বিক্ষোভের মুখে অ্যাটর্নি জেনারেল: এম ইউ আহমেদের মৃত্যুর খবর পেয়ে বিকেল পাঁচটায় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান স্কয়ার হাসপাতালে যান। অভ্যর্থনাকক্ষেই আইনজীবী ও বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাঁকে পেছন থেকে ‘খুনি’, ‘ধর ধর’ ইত্যাদি আওয়াজ তুলে ধাওয়া করেন। এ সময় পুলিশ ধাওয়াকারীদের ঠেকানোর চেষ্টা করে। তখন অ্যাটর্নি জেনারেল হাসপাতালের লিফটে করে চারতলায় চলে যান। ততক্ষণে ধাওয়াকারী আইনজীবীরা পুলিশের বাধা অতিক্রম করে সিঁড়ি দিয়েই চারতলায় গিয়ে বিক্ষোভ করেন। এই পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল পুলিশের পাহারায় করোনারি কেয়ার ইউনিটের (সিসিইউ) ভেতরে ঢুকে আশ্রয় নেন। আর বিএনপি-সমর্থক আইনজীবীরা সিসিইউর সামনে বিক্ষোভ করতে থাকেন। পরে অ্যাটর্নি জেনারেল পুলিশের পাহারায় হাসপাতাল ছেড়ে যান। 
এরপর বিক্ষোভকারীরা হাসপাতালের সামনের রাস্তায় অবস্থান নেন এবং সেখানেই ইফতার করেন। তবে ইফতারের পর তাঁরা রাস্তার অবরোধ তুলে নেন। 
হাসপাতালে অ্যাটর্নি জেনারেলের উপস্থিতির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘তিনি এসে একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে সঙ্গে নিয়ে লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। কিন্তু আমাদের কাউকেই যেতে দেওয়া হয়নি। সুরতহাল প্রতিবেদনকে প্রভাবিত করতেই অ্যাটর্নি জেনারেল এসেছেন বলে আমরা মনে করছি।’
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মাহবুব বলেন, ‘লাশের গায়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল। সুরতহাল প্রতিবেদনে সেই চিহ্নের উল্লেখ থাকবে না বলে আশঙ্কা করছি আমরা।’
কর্মসূচি: বিএনপির এই ঘটনায় গতকাল কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে দলের পক্ষ থেকে আজ শনিবার সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশ হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে বেলা সাড়ে ১১টায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এই কর্মসূচি পালিত হবে। 
অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইজিপির পদত্যাগের দাবিতে সোমবার সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশ করা হবে। ওই দিন দেশের সব আইনজীবী সমিতিতে এই কর্মসূচি পালিত হবে। 
বিবৃতি: এম ইউ আহমেদের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) ও বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ। পৃথক শোকবার্তায় বলা হয়েছে, এই মৃত্যুর দায় পুলিশ প্রশাসন ও সরকারের।
From:Prothomalo.com, 27.08.2011

No comments:

Post a Comment